বাংলাদেশের শীতকাল মানেই খেজুরের রসে ভরা মাটির হাঁড়ির ছবি—যা শুধু একটি খাদ্যাভ্যাস নয়, বরং গ্রামবাংলার আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। একসময় গ্রামে সহজেই পাওয়া যেত এই কাঁচা রস। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা শহুরে জীবনে পরিণত হয়েছে এক ধরনের দুর্লভ ও আকাঙ্ক্ষিত শীতকালীন পানীয়তে। বিশেষ করে শীতের সকালে এক গ্লাস কাঁচা খেজুর রস অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য ও বিলাসের প্রতীক।
এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি অনলাইনে গড়ে উঠেছে খেজুরের কাঁচা রস বিক্রির একটি বিপজ্জনক বাজার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত পেজ ও অ্যাকাউন্ট ‘খাঁটি’, ‘নিরাপদ’, ‘নিষ্কলুষ’—এমন নানা দাবি তুলে কাঁচা খেজুর রস বিক্রি করছে। রাজধানী ঢাকাসহ যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজশাহী ও গাজীপুরের মতো বিভিন্ন জেলার নাম ব্যবহার করে এসব রস অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাজারজাত করা হচ্ছে।
খাঁটি বিডি, জারিফ ফুডস, বিখ্যাত ৬৪, খেজুরতলা, সাধ্যের মধ্যে, ফ্রেশ ফুড হাট ডটকম—এ ধরনের বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে দাবি করা হচ্ছে, বাদুড় ও পাখির সংস্পর্শ এড়াতে গাছে জাল ব্যবহার করা হয় এবং রসটি ‘ফ্রেশ’ ও ‘এনার্জি ড্রিংক’ হিসেবে নিরাপদ।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এসব দাবিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, কাঁচা খেজুর রস নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর একটি প্রমাণিত মাধ্যম। নিপাহ ভাইরাস একটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী রোগ, যার কোনো কার্যকর চিকিৎসা এখনো নেই। বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার প্রায় ৮০ শতাংশ।
স্বাস্থ্যখাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৩৪৩ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই আক্রান্ত পাঁচজনের সবাই মারা গেছেন, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, কাঁচা খেজুর রস ফ্রিজে সংরক্ষণ বা ঠান্ডা করে সরবরাহ করলেও তা নিরাপদ হয় না। কারণ, ফ্রিজিং তাপমাত্রায় নিপাহ ভাইরাস সক্রিয় থাকতে পারে। কোন রসে ভাইরাস রয়েছে আর কোনটিতে নেই—এটা সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করার কোনো উপায় নেই।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কাঁচা খেজুর রস পান করার ঝুঁকি অনেকটা নোংরা হাতে ভাত খাওয়ার মতো। সবাই অসুস্থ না হলেও যাঁরা আক্রান্ত হন, তাঁদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি। তাঁর মতে, খেজুরের রস অবশ্যই ফুটিয়ে পান করা উচিত অথবা পিঠা ও গুড় তৈরিতে ব্যবহার করাই নিরাপদ।
সরকারি দপ্তর ও গবেষণা সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করলেও অনলাইন ব্যবসায়ীরা এসব উপেক্ষা করে অবাধে কাঁচা রস বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, এখনই জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইনে কাঁচা খেজুর রসের বিক্রি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
খেজুরের রস বাংলাদেশের শীতকালীন ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই নিরাপদভাবে তা উপভোগ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে—এমনটাই মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: আজহারুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ইব্রাহিমপুর, মিরপুর, ঢাকা-১২১০। আঞ্চলিক কার্যালয়: উকিলের মোড়, কলেজ স্টেশন রোড়, নীলফামারী।