
নিজস্ব প্রতিবেদন : নীলফামারীর যুব সমাজ, তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তরুণ সংগঠক মোঃ আব্দুল মোমিন। রংপুর বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলা নীলফামারীর কাঞ্চনপাড়া গ্রামে ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই গ্রামের জীবন, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও অবহেলার বাস্তব চিত্র খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তার। এই অভিজ্ঞতা থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন তার মনে জন্ম নেয়। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন অবহেলিত মানুষের সংগ্রাম, এবং উপলব্ধি করেছেন কেউ এগিয়ে এলে তবেই সমাজে পরিবর্তন সম্ভব।
সমাজ পরিবর্তনের এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১২ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠনের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার অভিজ্ঞতা ও চিন্তাধারা তাকে আরও বড় কিছু করার অনুপ্রেরণা দেয়। এক পর্যায়ে ২০১৩ সালে বাস্তবমুখী ও টেকসই উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য একটি সংগঠন গঠনের স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে ২০১৪ সালে স্ব-উদ্যোগে কয়েকজন উদীয়মান যুবককে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দ্বীপ্তমান যুব উন্নয়ন সংস্থা। বর্তমানে এই সংগঠনটি নীলফামারী জেলার ছয়টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৪০। সংগঠনটি যুব নেতৃত্ব বিকাশ, সমাজকল্যাণ এবং ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে সফলভাবে রেজিস্ট্রেশন অর্জন করেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর থেকে ধারাবাহিকভাবে নিবন্ধন গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি সুসংগঠিত ও স্বীকৃত অবস্থানে নিয়ে আসেন। মোঃ আব্দুল মোমিন কেবল একজন সংগঠক নন, তিনি একজন উদ্যমী তরুণ উদ্যোক্তাও। নিজের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন দ্বীপ্তমান গ্রুপ, যেখানে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কলম ও খাতা উৎপাদন করা হচ্ছে। তার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য একদিন স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারেও স্থান করে নেবে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
শিক্ষাগত জীবনে তিনি কাঞ্চনপাড়া ফারুক আহমেদ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, জমিরউদ্দীন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি, নীলফামারী সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের জন্য তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া, অটো ক্যাড, ডিজিটাল মার্কেটিং, ইংরেজি স্পোকেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগির খামার, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণন, যুব বিনিময়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কৌশল, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯, প্যাক্টা অ্যাপ এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ। এসব প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নেতৃত্ব, দল ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক সমন্বয়, ইভেন্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, সৃজনশীল লেখা, সমস্যা বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানে তিনি নিজেকে দক্ষ করে তুলেছেন।
বর্তমানে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ও কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি (নাসিব) নীলফামারী জেলার সভাপতি, দ্বীপ্তমান মানবউন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, দ্বীপ্তমান যুব উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, দ্বীপ্তমান নারী কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক, দ্বীপ্তমান গ্রুপের উদ্যোক্তা, দ্বীপ্তমান স্মার্ট বিজ্ঞান পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, দ্বীপ্তমান বাংলাদেশ সাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, কাঞ্চনপাড়া ফল-ফসল কৃষক গ্রুপের সভাপতি, নীলফামারী আরটিআই গ্রুপের সভাপতি এবং নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল কেন্দ্রিক টিআইবি অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ণ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নীলফামারী জেলা হস্তশিল্প অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, নীলফামারী সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী মাদকবিরোধী কমিটির আহ্বায়ক, বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক ফাউন্ডেশনের সহ-প্রধান স্বেচ্ছাসেবক, হাজীগঞ্জ বাজার হতে কাঞ্চনপাড়া পর্যন্ত সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের সভাপতি এবং বিসিক শিল্প নগরী, সৈয়দপুরের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি জেলা বিনিয়োগ ও ব্যবসা উন্নয়ন সহায়তা বিষয়ক কমিটি, জাতীয় যুব কাউন্সিল (সদর, নীলফামারী), নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, মেলা বাস্তবায়ন কমিটি, জেলা ঋণ মনিটরিং কমিটি, জেলা এনজিও সমন্বয় কমিটি এবং শহর সমাজসেবা সমন্বয় কমিটির সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মাদার তেরেসা গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড, ভলান্টিয়ার পয়েন্টস অ্যাওয়ার্ড, এসএমই ফাউন্ডেশন সম্মাননা, অভিজ্ঞানপত্র, জাতীয় পিঠা উৎসব সম্মাননা, রংপুর বিভাগীয় ও নীলফামারী জেলা পর্যায়ের ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড, জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া, জেলা যুব ফোরাম সম্মাননা স্মারক, নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সম্মাননা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সম্মাননা, নীলসাগর রেসিডেন্সিয়াল একাডেমি সম্মাননা, জাতীয় গণগ্রন্থাগার দিবস সম্মাননা, পরিবেশ অধিদপ্তরের বিশ্ব পরিবেশ দিবস সম্মাননা, ডোমার উপজেলা ভলান্টিয়ারিং ইয়ুথ ফোরাম সম্মাননা, বন্ধু যুব উন্নয়ন সংস্থা সম্মাননা, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের স্বেচ্ছাসেবী যুব ফোরাম সম্মাননা, বিসিক উদ্যোক্তা মেলা বেস্ট অ্যাওয়ার্ড, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তা সম্মেলন সম্মাননা, পঞ্চগড় উদ্যোক্তা উন্নয়ন হাব সম্মাননা, নাসিব কেন্দ্রীয় সম্মাননা, আলোর পথযাত্রী সাংস্কৃতিক পরিষদের রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান এবং দ্বীপ্তমান যুব উন্নয়ন সংস্থার সম্মাননা অর্জন করেছেন।
তার নেতৃত্বে তৃণমূল পর্যায়ের বেকার যুবক ও যুব নারীদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি ৮২০ জন বেকার যুবককে গরু মোটাতাজাকরণ, ৩১০ জনকে হাঁস-মুরগি পালন, ১৪০ জনকে টেইলারিং, ২৫০ জনকে গবাদিপশু পালন, ৩৭০ জন নারীকে কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ, ২৩০ জনকে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ৩৭৫ জনকে কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং ২৩০ জনকে দক্ষতা ও ভাষাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। এছাড়াও প্রায় ২০০ জনকে উৎপাদনশীলতা বিষয়ক কর্মশালা এবং পাঁচ দিনব্যাপী পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যার ফলে বহু যুবক-যুবতী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে এবং স্বাবলম্বী হয়েছে।
তার সমাজসেবামূলক কার্যক্রম অত্যন্ত বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। তিনি শতাধিক বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ভূমিকা রেখেছেন, নির্যাতিত অসহায় নারীদের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শব্দ দূষণ প্রতিরোধে তিনি ১৫টি আলোচনা সভা, ১০ হাজার লিফলেট বিতরণ এবং ১৫টি মানববন্ধনের আয়োজন করেছেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করেছেন, দুই হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে চারা এবং এক হাজার কৃষকের মাঝে বীজ বিতরণ করেছেন। মাদকবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৮টি মানববন্ধন, ২০ হাজার লিফলেট বিতরণ এবং প্রায় ৭৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা আয়োজন করেছেন, যার ফলে শতাধিক তরুণ মাদকমুক্ত জীবনে ফিরে এসেছে। করোনা মহামারির সময় তিনি ১৫ হাজার মানুষের মাঝে মাস্ক বিতরণ, ২ হাজার ৫০০ মানুষের মাঝে ত্রাণ সহায়তা প্রদান এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষকে ভ্যাকসিন গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করেছেন। এছাড়াও শীতকালে ৩ হাজার ৮০০ শীতবস্ত্র বিতরণ, শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ফরম ফিলাপে আর্থিক সহায়তা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় স্কুলে ফিরিয়ে আনা, ২৪টি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং এতিম শিশুদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের মতো মানবিক কার্যক্রম তিনি নিয়মিতভাবে পরিচালনা করে আসছেন।
তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করতে তার নিরলস প্রচেষ্টা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে তার উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অর্থ সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও তার কার্যক্রম কখনো থেমে থাকেনি। বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি তার কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তার নেতৃত্বেই নীলফামারীর ছয়টি উপজেলায় যুব সংগঠন ও উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
মোঃ আব্দুল মোমিনের স্বপ্ন যুব সমাজকে দক্ষ, আত্মনির্ভরশীল ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং একটি সুশাসিত, উন্নত ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, দূরদর্শিতা ও অক্লান্ত পরিশ্রম ইতোমধ্যেই তাকে নীলফামারীর যুব উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির এক অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: আজহারুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ইব্রাহিমপুর, মিরপুর, ঢাকা-১২১০। আঞ্চলিক কার্যালয়: উকিলের মোড়, কলেজ স্টেশন রোড়, নীলফামারী।