
বাংলাদেশে তরুণ ও অবিবাহিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) সংক্রমণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন করে শনাক্ত হওয়া এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে ৪২ শতাংশই তরুণ-তরুণী। এক বছর আগেও এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ১ হাজার ৮৯১ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ভাইরাসজনিত জটিলতায় ২১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, ইনজেকশনযোগ্য মাদক ব্যবহার, কনডমসহ সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার না করা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব উল্লেখযোগ্য। পরিবার ও সমাজে এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায় অনেক তরুণ ভুল ধারণা ও কৌতূহলের বশে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক তরুণ জানান, ব্যবহৃত সুচ ভাগাভাগি করার ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি আগে সচেতন ছিলেন না। আরেক তরুণের ভাষ্য, সমাজে তরুণদের আচরণ নিয়ে নৈতিকতার আলোচনা বেশি হলেও নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কথা খুব কমই হয়।
এ বিষয়ে ইউএনএইডস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান বলেন, অসচেতনতা ও রোমাঞ্চপ্রবণতা অনেক তরুণকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার মতে, নিরাপদ যৌন আচরণ ও নিয়মিত সচেতনতামূলক শিক্ষাই এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, এইচআইভি এখন আর মৃত্যুদণ্ডের সমান নয়। নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে সামাজিক লজ্জা ও ভয়ের কারণে অনেক তরুণ আক্রান্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন।
রাজধানীর বাড্ডা এলাকার এক এইচআইভি আক্রান্ত তরুণ বলেন, নিয়মিত চিকিৎসায় তিনি এখন সুস্থ জীবন কাটাচ্ছেন, তবে নিজের ভুল থেকে অন্যদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, নগরায়ণ ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে তরুণদের যৌন আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতা না বাড়ায় ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে। মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো সহজেই তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্কুল পর্যায় থেকে কার্যকর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করা, সামাজিক লজ্জা ভাঙা এবং তরুণদের জন্য ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা দরকার, যাতে এইচআইভি সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
মন্তব্য করুন