
বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি)। তবে একক খাতে অতিনির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণার প্রেক্ষাপটে নতুন রপ্তানি খাত চিহ্নিত করে সেগুলোর বিকাশে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশীয়ভাবে গড়ে ওঠা সম্ভাবনাময় ফার্নিচার শিল্পকে সামনে আনা হচ্ছে বিকল্প রপ্তানি চালিকাশক্তি হিসেবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ ফার্নিচার বাজারের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও এ বাজারের একটি বড় অংশ ব্র্যান্ডবিহীন ও অনিয়মিতভাবে পরিচালিত দোকানের দখলে, তবুও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু দেশীয় ব্র্যান্ড আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন পণ্যের মাধ্যমে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে যেখানে ফার্নিচার রপ্তানি ছিল মাত্র ২৭ মিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১০ মিলিয়ন ডলারে। অথচ বৈশ্বিক পরিসরে এই খাতের সম্ভাবনা বহুগুণ বেশি। গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব ফার্নিচার বাজারের আকার দাঁড়াবে ৭৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
তবে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও অতি সীমিত। বছরে গড়ে ১০০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানির তুলনায় চীন, ভিয়েতনাম ও পোল্যান্ড ইতোমধ্যে কৌশলগত সরকারি সহায়তায় শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, কাঁচামালের সংকট, উচ্চ আমদানি শুল্ক, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অভাব, এবং রপ্তানিবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে দুর্বলতা এই খাতের বড় বাধা হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি সেলিম এইচ রহমান বলেন, “শুধু পোশাকনির্ভরতা আমাদের রপ্তানিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ফার্নিচার খাত হতে পারে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি ভিত্তি। দেশীয় সক্ষমতা, শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক চাহিদা সবই রয়েছে—প্রয়োজন কেবল নীতিগত সহায়তা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা।”
সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে করণীয়:
আংশিক রপ্তানিমুখী ফার্নিচার শিল্পকে শতভাগ ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্ক বন্ড সুবিধা দেওয়া
ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ উন্নয়ন এবং কাঁচামাল আমদানিতে সহজীকরণ
শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা
জাতীয় শিল্পনীতি, আমদানি নীতি ও রপ্তানি নীতি বাস্তবায়নে বাস্তবিক অঙ্গীকার
নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রোডম্যাপ তৈরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় দেশের রপ্তানিতে বহুমুখীকরণ আনা এবং সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। সরকার, নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে ফার্নিচার শিল্পকে পরবর্তী রপ্তানি সফলতায় রূপ দিতে।
মন্তব্য করুন