
গত এক বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রমে দেখা গেছে, দেশে ঘুষ ও দুর্নীতির মাত্রা এখনো উদ্বেগজনক। কমিশনের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে দুদক মোট ৭৬৮টি অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তের জন্য গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৩৯৯টি মামলার পাশাপাশি ২৩১টি অভিযোগপত্র দাখিল এবং ৯টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কমিশন থেকে ২২৩ জনের বিরুদ্ধে সম্পদের হিসাব দাখিলের নোটিশও জারি করা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, নতুন চেয়ারম্যান ড. মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মোমেন দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসেই সর্বোচ্চ ৭০টি মামলা হয়েছে, যা একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ।
গত ১১ মাসে দায়েরকৃত মামলাগুলোতে মোট আসামির সংখ্যা ১ হাজার ২৬৪ জন। এর মধ্যে ২৪৩ জন সরকারি কর্মকর্তা, ১১৪ জন ব্যবসায়ী, ৯২ জন রাজনীতিবিদ, ৪৪৭ জন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও ৩১ জন জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, টেন্ডারে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, জমি ও ফ্ল্যাট দখল এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ।
বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে বাড়ি কেনা এবং ব্যবসা চালানোর মতো অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে কারসাজি এবং ব্যাংক ঋণের নামে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মতো বড় ধরনের অপরাধের তথ্যও দুদকের হাতে এসেছে।
এদিকে, ১১ মাসে কমিশনে জমা পড়েছে মোট ১২ হাজার ৮২৭টি অভিযোগ, যার মধ্যে গত বছরের নভেম্বরেই জমা পড়েছে রেকর্ডসংখ্যক ৩ হাজার ৪০৬টি অভিযোগ। কমিশন চেয়ারম্যানের দপ্তরসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি অভিযোগ নিয়েও কাজ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দেওয়া এখন যেন এক প্রাত্যহিক বাস্তবতা। নাগরিকরা মনে করেন, ঘুষ না দিলে সেবা মিলবে না কিংবা বিলম্ব হবে। এটা রাষ্ট্রের বড় ব্যর্থতা।”
তিনি আরও বলেন, “সেবা পাওয়া নাগরিকের অধিকার হলেও বর্তমানে সেই সেবা পেতে ঘুষ দিতে হচ্ছে। এটা একধরনের প্রতারণা, যা রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মেনে নিচ্ছে। মুখে ‘জিরো টলারেন্স’ বললেও বাস্তবে তার প্রমাণ নেই। ঘুষের সংস্কৃতি বন্ধে সরকারের উচিত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।”
বিশ্লেষকদের মতে, সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে ঘুষের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মন্তব্য করুন