ক্রীড়া ডেস্ক: ২০৩০ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় অনুষ্ঠিত হবে—মরক্কো নাকি স্পেনে, তা নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে মরক্কো ও স্পেন উভয়েই ফাইনাল নিজেদের মাটিতে আয়োজনের দাবি জানাচ্ছে। তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লাকজা দাবি করেন, ক্যাসাব্লাঙ্কার কাছে নির্মাণাধীন কিং হাসান-২ স্টেডিয়ামেই ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। তাঁর এই বক্তব্যের পরই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক এক সমাবেশে লাকজা বলেন, বেনস্লিমান শহরেই বিশ্বকাপের ফাইনাল হবে এবং ভেন্যু হিসেবে হাসান-২ স্টেডিয়াম নির্ধারিত। এমনকি তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ফাইনালে মরক্কোর জাতীয় দলও খেলবে।
তবে মরক্কো সভাপতির এই দাবির সঙ্গে ফিফার অবস্থানের মিল নেই। সংস্থাটির এক মুখপাত্র ইএফইকে জানিয়েছেন, ফাইনালের ভেন্যু নিয়ে সিদ্ধান্ত যথাযথ সময়ে জানানো হবে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত কোনো দেশকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনালের আয়োজক হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
স্পেনেরও জোর দাবি
ফাইনাল নিজেদের দেশে আয়োজনের বিষয়ে পিছিয়ে নেই স্পেনও। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি রাফায়েল লৌসান সম্প্রতি বলেছেন, ফাইনাল আয়োজনের ক্ষেত্রে স্পেনের দাবিই সবচেয়ে যৌক্তিক। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি।
লৌসানের মতে, স্পেন পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেশটির পাওয়া উচিত।
ফাইনালের সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে স্পেনের বেশ কয়েকটি বড় স্টেডিয়াম রয়েছে। এর মধ্যে বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যু সংস্কারের পর প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার দর্শক ধারণ করতে পারবে। অন্যদিকে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রায় ৭৮ হাজার ২৯৭ দর্শকের বসার ব্যবস্থা রয়েছে।
মরক্কোর নতুন স্টেডিয়াম
মরক্কোর প্রস্তাবিত ভেন্যু কিং হাসান-২ স্টেডিয়ামটি বেনস্লিমান শহরে, ক্যাসাব্লাঙ্কার কাছাকাছি নির্মাণ করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্টেডিয়ামটিতে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক একসঙ্গে খেলা দেখতে পারবেন। নির্মাণ শেষ হলে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হতে পারে।
এই স্টেডিয়ামকে ঘিরেই মরক্কো ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের বড় স্বপ্ন দেখছে।
ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে অপেক্ষা
২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর থেকেই ২০৩০ সালের ফাইনাল নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। তবে গত ৫ আগস্টও ফিফা জানিয়েছিল, উপযুক্ত সময়ে ফাইনালের আয়োজক ভেন্যু সম্পর্কে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এর আগে এমন খবরও ছড়িয়েছিল যে, আগামী মার্চে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নির্বাচনে সমর্থনের বিনিময়ে মরক্কোকে বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে ফিফা সে ধরনের কোনো সমঝোতার কথা অস্বীকার করেছে।
ইউরোপ বনাম আফ্রিকার টানাপোড়েন
২০৩০ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল। পাশাপাশি শতবর্ষ উপলক্ষে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে কয়েকটি উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে অনুষ্ঠিত হওয়ার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষেই দক্ষিণ আমেরিকার এই তিন দেশকে উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় ফুটবল মহলের একটি অংশ মনে করছে, মূল আয়োজনের বড় অংশ ইউরোপে হওয়ায় বিশ্বকাপের ফাইনালও ইউরোপেই হওয়া উচিত। অন্যদিকে মরক্কো নিজেদের নতুন অবকাঠামো ও আফ্রিকান ফুটবলের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি সামনে রেখে ফাইনাল আয়োজনের দাবি করছে।
ইনফান্তিনোর মরক্কো সফর ঘিরেও আলোচনা
ফাইনাল বিতর্কের মধ্যে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক মরক্কো সফরও আলোচনায় এসেছে। তিনি সম্প্রতি দুই দফায় দেশটি সফর করেছেন। জুলাইয়ে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের সিংহাসনে আরোহণের বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন ইনফান্তিনো। এরপর আগস্টে মরক্কোতেই ফিফার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে উয়েফার সঙ্গে ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটেও মরক্কোর অবস্থান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মরক্কোসহ কয়েকটি আরব দেশের ফুটবল ফেডারেশন ইনফান্তিনোকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
পুরোনো কূটনৈতিক উত্তেজনাও সামনে
ফাইনাল নিয়ে মরক্কো ও স্পেনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি দুই দেশের পুরোনো কূটনৈতিক টানাপোড়েনও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে স্পেনের উত্তর আফ্রিকার ভূখণ্ড সেউতায় সীমান্ত অতিক্রম করে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টের প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। ওই ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটে। পরবর্তী সময়ে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও স্পেনের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, মরক্কো সরকার পরিকল্পিতভাবে ওই ঘটনা ঘটিয়েছিল—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু একটি ক্রীড়া ইভেন্টের ভেন্যু নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দুই দেশের মর্যাদা, ফুটবল অবকাঠামো এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ও জড়িয়ে পড়েছে।
এখন মূল অপেক্ষা ফিফার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের। সংস্থাটি কবে এবং কোন দেশকে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনালের আয়োজক হিসেবে বেছে নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।



