northmail24.comউত্তরবঙ্গের মানুষের কথা বলে...
বিজ্ঞাপন
ব্রেকিং
মুসলমানের হাসিতে সদকার সওয়াব, নবীজি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে মরক্কো-স্পেনের দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্ত জানায়নি ফিফানজরুলকে বাদ দিয়ে জাতীয় চেতনার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ অসম্ভবহাম ও উপসর্গে একদিনে ৭ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১ হাজার ৯জলঢাকায় পোনামাছ অবমুক্তকরণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিতবিদ্যুৎ সংকট: অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ছে বিতর্কক্রেতা-বিক্রেতার সময় ও ঝামেলা কমাতে ‘সুপার সেল কার বাজার’দেবীগঞ্জে গরুর হাটে অতিরিক্ত টোল আদায়, হাট ইজারাদারকে ২০ হাজার টাকা জরিমানামাদকাসক্ত ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন বাবা, ৩ মাসের কারাদণ্ডপরিবেশ বিষয়ক জনসচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
নীলফামারী সদর

মুসলমানের হাসিতে সদকার সওয়াব, নবীজি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল

মুসলমানের হাসিতে সদকার সওয়াব, নবীজি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল

নিজস্ব প্রতিবেদক
হাসি মানুষের অন্যতম সুন্দর অভিব্যক্তি। একটি আন্তরিক হাসি মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও আপনত্বের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতেও হাসিমুখে মানুষের সঙ্গে কথা বলা শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়, বরং এটি সওয়াবের কাজ।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও হাস্যোজ্জ্বল আচরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে কোমল ও প্রফুল্ল আচরণ করতেন এবং মানুষকে কাছে টানার ক্ষেত্রে হাসিকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন।

হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা মানুষের আচরণেও ফুটে ওঠে। হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও কপটতা থেকে মুক্ত অন্তর মানুষের কথাবার্তা ও মুখের অভিব্যক্তিতে স্বাভাবিকভাবেই কোমলতা এনে দেয়। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সর্বোত্তম মানুষ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিশুদ্ধ অন্তর ও সত্যভাষী ব্যক্তির কথা বলেন। বিশুদ্ধ অন্তরের মানুষ বলতে তিনি এমন ব্যক্তিকে বোঝান, যার অন্তরে পাপ, শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ও কপটতা নেই। (ইবনে মাজা: ৪২১৬)

ইসলামে হাসির ধরন

ইসলামি আলোচনায় হাসির কয়েকটি ধরন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ‘তাবাসসুম’ হলো মুচকি হাসি। এতে সাধারণত কোনো উচ্চ শব্দ হয় না; মুখে শুধু হাসির অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্বাভাবিক আচরণে এমন হাসির উপস্থিতি ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে কাউকে দেখেননি। (তিরমিজি: ৩৬৪১)

আরেক ধরনের হাসিকে ‘দিহক’ বলা হয়, যেখানে দাঁত দেখা যেতে পারে এবং হালকা শব্দও হতে পারে। এটি বৈধ হলেও সংযত থাকা উত্তম। অন্যদিকে অট্টহাসি বা ‘কাহকাহা’কে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই মুসলমানের জন্য পরিমিত ও মার্জিত হাসিই উত্তম আচরণ।

হাসিমুখে সাক্ষাৎও সদকা

হাসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি মানুষের প্রতি সদাচরণের একটি অংশ। আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিজের মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও সদকা। (তিরমিজি: ১৯৫৬)

কারও মুখে হাসি ফোটানো কিংবা তাকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা তার মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। এ কারণেই ইসলামে হাসিমুখে কথা বলা ও মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণেও এর বাস্তব উদাহরণ দেখা যায়। জারির (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর থেকে নবীজির কাছে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বাধা পাননি। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই তার দিকে তাকাতেন, মুচকি হাসতেন। (বুখারি: ৩০৩৫)

নবীজির হাসিতে ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা

রাসুলুল্লাহ (সা.) এমনভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন যে, প্রত্যেক সাহাবিই তাঁর কাছ থেকে বিশেষ ভালোবাসা পাওয়ার অনুভূতি করতেন। তাঁর হাসিমুখ ও আন্তরিক আচরণ মানুষকে নির্ভয়ে নিজের কথা বলার সুযোগ করে দিত।

কাব ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি নবীজির সঙ্গে দেখা করলে আনন্দে তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠত। তাঁর মুখমণ্ডলের আনন্দ দেখে সাহাবিরা তা বুঝতে পারতেন। (বুখারি: ৩৫৫৬)

সাহাবিদের দৈনন্দিন জীবনেও রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বাভাবিকভাবে মিশতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.)-এর একটি ঘটনায় দেখা যায়, তার একটি আচরণ শুনে নবীজি রাগ না করে মৃদু হেসেছিলেন। (মুসলিম: ৪৪৯৬)

অধীনস্থদের সঙ্গেও কোমল আচরণ

কাজের ক্ষেত্রে কেউ ভুল করলে অনেক সময় মানুষের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সেবায় থাকা ব্যক্তিদের প্রতিও ছিলেন অত্যন্ত কোমল।

আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় ১০ বছর নবীজির সেবা করেছেন। তিনি জানান, এই দীর্ঘ সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো তাকে রাগ করে ‘কেন এমন করেছ’ বা ‘কেন এমন করোনি’—এ ধরনের কথা বলেননি।

অন্য এক ঘটনায় আনাস (রা.) বলেন, নবীজি তাকে একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পথে সমবয়সী শিশুদের খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর নবীজি সেখানে এসে তার ঘাড়ে হাত রাখেন এবং তিনি ফিরে তাকালে দেখতে পান, রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসছেন। (আবু দাউদ: ৪৭৭৩)

পারিবারিক জীবনেও ছিল হাসিমুখ

শুধু সাহাবি বা বাইরের মানুষের সঙ্গেই নয়, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল ও আন্তরিক।

আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে নবীজির একটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, তাঁর ঘরে থাকা খেলনা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করেন। একটি খেলনা ঘোড়ার সঙ্গে দুইটি পাখা দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। আয়েশা (রা.) মজা করে সুলাইমান (আ.)-এর ঘোড়ার কথা উল্লেখ করলে নবীজি হেসে ওঠেন। (আবু দাউদ: ৪৯৩২)

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ক্ষেত্রেও নবীজি আনন্দ, রসিকতা ও হাস্যরসকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতেন।

অমুসলিমদের প্রতিও সৌহার্দ্য

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাসিমুখ কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সঙ্গে তিনি সৌজন্য ও মানবিকতার আচরণ করতেন।

একবার এক ইহুদি ব্যক্তি কেয়ামতের দিনের মেহমানদারি সম্পর্কে নবীজির সঙ্গে কথা বলেন। তার বক্তব্য শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে হাসেন; এমনকি তাঁর দাঁতও প্রকাশিত হয়। (বুখারি: ৬৫২০)

অন্যের হাসির জন্যও দোয়া

ইসলাম শুধু নিজে হাসিমুখে থাকার শিক্ষা দেয় না; অন্যের আনন্দ ও হাসিকেও মূল্য দিতে শেখায়। কারও হাসি দেখে তার জন্য ‘আদহাকাল্লাহু সিন্নাকা’ দোয়া করার কথা বর্ণিত হয়েছে। এর অর্থ—আল্লাহ আপনার হাসি অটুট রাখুন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাসি দেখে উমর (রা.) এ দোয়া করেছিলেন বলে হাদিসে এসেছে। (বুখারি: ৩২৯৪)

শেষ দিনেও উম্মতের দিকে হাসিমুখে তাকিয়েছিলেন

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ সময়েও তাঁর হাস্যোজ্জ্বলতার একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা রয়েছে।

আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের দিন সোমবার ফজরের নামাজে আবু বকর (রা.) ইমামতি করছিলেন। নবীজি (সা.) আয়েশা (রা.)-এর কক্ষের পর্দা সরিয়ে সাহাবিদের নামাজের কাতারে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি মৃদু হাসেন। এরপর ওই দিনই তাঁর ইন্তেকাল হয়। (বুখারি: ১২০৫)

হাসি তাই শুধু মুখের একটি অভিব্যক্তি নয়; এটি মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের প্রকাশ। ইসলামে পরিমিত ও আন্তরিক হাসিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি—কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষের সঙ্গে কোমল ও হাসিমুখে আচরণ করা সম্ভব।

তাই একজন মুসলমানের উচিত অহংকার, বিদ্বেষ ও রূঢ়তা পরিহার করে মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা। একটি আন্তরিক হাসি হয়তো বড় কোনো দান নয়, কিন্তু কারও মন ভালো করে দিতে পারে—আর সেই কারণেই ইসলামে হাসিমুখে সাক্ষাৎকেও সদকার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ এক্স টেলিগ্রাম

আপনার মতামত জানান

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুযায়ী প্রকাশিত হবে।